ভাবুন, আপনি যাচ্ছেন বান্দরবানের গভীর জঙ্গলে অভিযানে। আগে থেকে গুগল ম্যাপ ডাউনলোড করেছেন, নিরাপদ থাকার জায়গা ঠিক করেছেন, পানিতে হাঁটার পথ চিনে নিয়েছেন, এমনকি কোথায় ভেলা বানিয়ে পার হতে হবে তাও জানেন। আপনার সাথে আছেন একজন দক্ষ গাইড। সব প্রস্তুতি নিয়েই আপনি যাত্রা শুরু করলেন এবং সফলভাবে পাহাড়-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
কিন্তু যদি এসব কিছু না থাকে? না থাকে গাইড, না থাকে মানচিত্র, না থাকে কোনো পূর্ব-পরিচিত তথ্য? হঠাৎ যদি আপনি নিজেকে গভীর জঙ্গলে আবিষ্কার করেন—তখন কী হবে?
এমন পরিস্থিতিতেই বোঝা যায়, একজন মানুষের সহনশীলতা (Resilience) কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সহনশীলতা কী?
সহনশীলতা মানে হলো জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মেনে নিয়ে ধৈর্য্য, বুদ্ধিমত্তা ও ইতিবাচক মানসিকতায় তা মোকাবেলা করার ক্ষমতা। এটি এমন একটি মানসিক গুণ যা কিছু মানুষকে বিপর্যয়ের মধ্যেও টিকে থাকতে এবং আগের থেকেও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে সাহায্য করে।
কেন সহনশীলতা জরুরি?
জীবনের অনেক কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও কেউ কেউ সফল হয়, আবার কেউ থেমে যায়। সহনশীল মানুষ:
- চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মানসিক শক্তি দেখায়
- হতাশ না হয়ে, পরিস্থতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়
- দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতা ধরে রাখতে পারে
অন্যদিকে, যাদের সহনশীলতার অভাব রয়েছে, তারা প্রায়শই আত্মঘাতী চিন্তা, একাকীত্ব, অথবা আত্মবিধ্বংসী সিদ্ধান্তে চলে যায়।
সহনশীলতা কি শেখা যায়?
হ্যাঁ, গবেষণায় দেখা গেছে, সহনশীলতা শুধু জন্মগত গুণ নয়—এটি ধীরে ধীরে শেখা যায়, গড়ে তোলা যায়। এমনকি যারা জীবনে বহু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে, তারাও শক্তিশালী সহনশীলতা তৈরি করতে পেরেছে। যেমন, মানবাধিকার কর্মী ম্যালকম এক্স বলেছিলেন—
“প্রতিটা হার, প্রতিটা মর্মবেদনা, প্রতিটা ক্ষতি সম্ভাবনার বীজ বহন করে।”
সহনশীলতা গড়ে তুলতে চারটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়
১. সংযোগ তৈরি করুন
- আপনার পাশে থাকা মানুষদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন
- সামাজিক গ্রুপ বা কমিউনিটিতে যুক্ত হন
- বিপদে পাশে থাকার মতো মানুষদের চিনে নিন
২. শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখুন
- পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যায়াম
- মেডিটেশন, নামাজ/প্রার্থনা বা ধ্যান
- মাদক বা ক্ষতিকর উপায়ে সমস্যা এড়ানোর চেষ্টাকে না বলুন
৩. জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নিন
- অন্যকে সাহায্য করুন
- নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করুন
- ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করুন
৪. ইতিবাচক চিন্তা করুন
- নেতিবাচক চিন্তাকে চিহ্নিত করে তা পাল্টান
- অতীত থেকে শেখা নিন
- পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলুন
বর্তমান বাস্তবতায় সহনশীলতার প্রয়োজন
করোনাকালীন সময় আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মানসিক শক্তি।
- স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব পালন
- শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তা
- শ্রমজীবীদের অর্থনৈতিক চাপ
- মানসিক রোগীদের বর্ধিত একাকীত্ব
সবাইকেই এক নতুন বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিতে হয়েছে। এখনই সময় আমাদের সহনশীল হওয়ার এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখার।
উপসংহার
সহনশীলতা হঠাৎ করে আসে না, এটি ধাপে ধাপে গড়ে উঠতে থাকে। আমরা যদি নিজেদের এই গুণে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ করতে পারি, তাহলে জীবনের যেকোনো ঝড়েও আমরা মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে পারবো।





