ঘটনাটি কেমন ছিল?
ধরা যাক, জনাকীর্ণ কোনো জায়গায় কয়েকজন মিলে একজন ব্যক্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তি সাহায্যের জন্য চিৎকার করছেন। আপনি ঘটনাটি দেখলেন, মনে হলো—সাহায্য করা উচিত। কিন্তু আপনি কিছুই করলেন না, ঠিক যেমন আশেপাশের অন্যরাও কিছু করলো না।
আপনি চলে এলেন, ঝামেলা এড়ালেন—কিন্তু মনের ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল। আপনি ভাবছেন, “আমার কি কিছু করা উচিত ছিল? যদি তাই হয়, তাহলে কেন করলাম না?”
মনোবিজ্ঞানে এই প্রশ্নগুলোর কিছু ব্যাখ্যা আছে।
কী বলা হয় পরার্থপরতা বা ‘অল্ট্রুইজম’কে?
অন্যকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করার মনোভাবকে বলা হয় পরার্থপরতা (Altruism)। সমাজ ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে এটি একটি মূল্যবান গুণ। আমাদের প্রত্যাশা, বিপদের সময় মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—সবাই সেটা করে না। কেন করে না, সেটা বুঝতেই সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণায় নামেন।
কেটি জেনোভেস হত্যাকাণ্ড: এক যুগান্তকারী ঘটনা
১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্কে কেটি জেনোভেস নামের এক তরুণীকে রাতের বেলায় তার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। কেটি সাহায্যের জন্য বারবার চিৎকার করলেও, আশপাশের ৩৮ জন প্রতিবেশী কেউ এগিয়ে আসেনি, এমনকি পুলিশেও ফোন করেনি।
এই ঘটনাটি মিডিয়ায় তীব্র আলোড়ন তোলে এবং গবেষকরা প্রশ্ন তোলেন—এত মানুষ দেখে থাকলেও কেউ কেন সাহায্য করলো না?
‘বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট’ ও দায়িত্ব ছড়িয়ে যাওয়া
এই ঘটনার পর জন ডার্লে ও বিব ল্যাটানে নামের দুই গবেষক ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করেন। তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ মনোবৈজ্ঞানিক ধারণা তুলে ধরেন—Bystander Effect বা প্রত্যক্ষদর্শী প্রভাব।
তাদের মতে:
- যখন আশেপাশে অনেক মানুষ থাকে, তখন প্রত্যেকে ভাবে, “অন্য কেউ নিশ্চয়ই কিছু করবে”।
- এভাবেই দায়িত্ব ছড়িয়ে যায় (Diffusion of Responsibility)—এককভাবে কেউই দায়িত্ব নেয় না।
তারা দেখতে পান, বিপদে পড়া কাউকে একজন ব্যক্তি একা দেখলে সে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে বেশি।
আমরা সাহায্য করবো কি করবো না—এটা কীভাবে নির্ধারিত হয়?
যখন আমরা কারো বিপদে পড়া দেখি, তখন মনের মধ্যে কয়েকটি চিন্তা একসাথে কাজ করে:
- পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক?
- আমি সাহায্য করলে আমার কী লাভ? বা কী ক্ষতি?
➤ সাহায্য করলে লাভ:
- নিজের কাছে ভালো লাগা কাজ করা
- অন্যের প্রশংসা পাওয়া
➤ সাহায্য করলে ক্ষতি:
- নিজে ঝামেলায় জড়ানো
- সময় ও শক্তি নষ্ট হওয়া
➤ সাহায্য না করলে লাভ:
- ঝামেলা এড়ানো
- নিজের স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যাওয়া
➤ সাহায্য না করলে ক্ষতি:
- অপরাধবোধে ভোগা
- সমাজের নিন্দা সহ্য করা
এখান থেকেই সিদ্ধান্ত আসে—“সাহায্য করবো কিনা?”
তাহলে মানুষ সাহায্য করে কখন?
- যখন মনে হয়, সাহায্য করলে ঝুঁকি কম, ভালো লাগা বেশি, তখন মানুষ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।
- বিপরীতে, ঝুঁকি বেশি, ভালো লাগা কম মনে হলে সাধারণত সাহায্য করে না।
- মাঝামাঝি অবস্থায়, মানুষ বিকল্প খোঁজে—যেমন পুলিশ ডাকতে পারে।
সাহায্য করার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন চুপ থাকে?
গবেষকরা বলছেন, অনেক সময় আমাদের ভেতরে কাজ করে—
- ভয়: “আমি যদি নিজেই বিপদে পড়ি?”
- অনিশ্চয়তা: “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কী করবো।”
আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো বলেছিলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক চাহিদা হলো নিরাপত্তা। আমরা সাহায্য করার আগে চিন্তা করি—আমি নিরাপদ তো?
তাহলে কি পরার্থপরতা হারিয়ে যাচ্ছে?
না, হারায়নি। বরং বলা যায়—আমাদের পরার্থপরতার ইচ্ছা এখন নিরাপত্তার চাপে চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমরা সাহায্য করতে চাই, কিন্তু পরিস্থিতি ও সমাজ কাঠামো আমাদের আটকে রাখে।
উপসংহার
মানুষের সাহায্য করার আকাঙ্ক্ষা প্রকৃতিগতভাবেই আছে। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশ, অনিশ্চয়তা, এবং নিরাপত্তার সংকট—এইসব কারণে আমরা অনেক সময় নিষ্ক্রিয় থাকি।
এই আচরণ বুঝে আমরা যদি সচেতন হই, তাহলে নিজে থেকে দায়িত্ব নিতে শেখা সম্ভব। আর তাতেই গড়ে উঠতে পারে একটি মানবিক সমাজ।





