আত্মহত্যা মানে নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া। এটি সাধারণত মানসিক রোগ, যেমন বিষণ্ণতা বা অন্যান্য কারণ থেকে হয়ে থাকে। আত্মহত্যা দুইভাবে হতে পারে—পরিকল্পিত এবং হঠকারী (ইমপালসিভ)। পরিকল্পিত আত্মহত্যা বেশি দেখা যায় মানসিক রোগে আক্রান্তদের মধ্যে, আর হঠকারী আত্মহত্যা বেশি হয় সম্পর্কের টানাপোড়েন বা মাদকাসক্তির কারণে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশের ‘সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ’ এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। বাংলাদেশেও প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন।
আত্মহত্যার কারণ কী?
মানুষ কেন আত্মহত্যা করে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বহু গবেষণা করেছেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষের ভেতরে একধরনের ধ্বংসাত্মক শক্তি থাকে, যা কখনো নিজের প্রতি ফিরে আসে। তখন সে নিজেকেই শেষ করতে চায়।
মানসিক রোগ ও আত্মহত্যা
বিষণ্ণতা, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, উদ্বেগ ও অন্যান্য মানসিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যার ৩৬-৯০% ক্ষেত্রে বিষণ্ণতা, ৪৩-৫৪% ক্ষেত্রে মদ্যপান এবং ৪-৪৫% ক্ষেত্রে অন্যান্য মাদকাসক্তি দায়ী।
মাদক ও আত্মহত্যা: বিপজ্জনক সংযোগ
মাদক গ্রহণ আমাদের মস্তিষ্কের রসায়নে পরিবর্তন আনে। আনন্দ পাওয়ার স্বাভাবিক উপায়গুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সে সামাজিকভাবে একা হয়ে যায় এবং বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তরা আত্মহত্যার চেষ্টা করে সাধারণ মানুষের তুলনায় ৬ গুণ বেশি, এবং সফল আত্মহত্যার হার ৩ গুণ বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঝুঁকি ৬.৫ গুণ বেশি। প্রবীণ মাদকাসক্তদের আত্মহত্যার ঝুঁকি তরুণদের তুলনায় বেশি।
হঠাৎ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত
বিশ্বখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মার্ক ইলগেন বলেন, “অধিকাংশ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হঠাৎ করেই আসে।” অনেকেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে। বিষণ্ণতা কাটাতে অনেকেই মাদক, জুয়া বা বিপজ্জনক অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে, যা বিপরীতভাবে আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মাদক ও আত্মহত্যার মিল থাকা ঝুঁকি
দুই সমস্যার পেছনে অনেক মিল পাওয়া যায়: বংশগত সমস্যা, মানসিক চাপ, নির্যাতন, বেকারত্ব, একাকীত্ব, প্রিয়জনের মৃত্যু ইত্যাদি। একাধিক ঝুঁকি একসাথে কাজ করলে আত্মহত্যার আশঙ্কা বাড়ে।
কোন মাদক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
মেথামফেটামিন, কোকেইন, ঘুমের বড়ি, ও অতিরিক্ত মদ্যপান আত্মহত্যার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। যদিও গাঁজা নিয়ে ঝুঁকি স্পষ্ট নয়, কিন্তু একাধিক মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে মাদকাসক্তির ভয়াবহ চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে প্রায় ৫০ কোটি মাদকাসক্ত রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে ৫০ লাখ, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক হিসাবে ৭০ লাখ থেকে এক কোটির বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে।
আশার আলো
ভালো খবর হচ্ছে—বিষণ্ণতা, আত্মহত্যার চিন্তা এবং মাদকাসক্তি সবই চিকিৎসায় ভালো হয়। উপযুক্ত ওষুধ ও মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসায় অনেকেই দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তাই সমস্যাকে গোপন না রেখে সাহস করে চিকিৎসা গ্রহণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।





