আক্রমণাত্বক বা আগ্রাসী আচরণ

TABLE OF CONTENTS

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। দিনের আলোতে প্রকাশ্য রাস্তায় ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির নামে মানুষকে মারধর বা হত্যা করা হচ্ছে। জাতি, ধর্ম, রাজনীতি কিংবা মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠী একে অপরকে আক্রমণ করছে, আবার অনেক সময় ব্যক্তিগত কারণেও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কেন হঠাৎ এতটা আক্রমণাত্মক বা আগ্রাসী হয়ে উঠলাম? এটা কি মানুষের স্বভাবজাত আচরণ, নাকি সমাজে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ? আসুন মনোবিজ্ঞানের আলোকে এর ব্যাখ্যা খুঁজে দেখা যাক।

আক্রমণাত্মক আচরণ কী?

মনোবিজ্ঞানে আক্রমণাত্মক আচরণ বলতে বোঝায়—যখন একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কাউকে বা কোনো কিছুকে ক্ষতি করার চেষ্টা করে, কিংবা সেই ক্ষতিতে অংশ নেয়।

এই আচরণ জন্মগত নাকি শেখা—এ নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে বহুদিন ধরেই মতভেদ আছে। প্রাচীন মতবাদ বলছে, এটি মানুষের ভেতরকার একটি সহজাত প্রবৃত্তি। আর আধুনিক তত্ত্ব অনুযায়ী, এটি মানুষের চারপাশের পরিবেশ থেকে শেখা একটি আচরণ।

থমাস হবস ও ফ্রয়েডের দৃষ্টিভঙ্গি

সপ্তদশ শতকে দার্শনিক থমাস হবস বলেন, “মানুষ মূলত প্রতিযোগিতামূলক ও শত্রুভাবাপন্ন। তারা সবসময় নিজের স্বার্থ ও ক্ষমতা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।” এই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি রাষ্ট্রীয় শাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডও প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে মানুষ আনন্দ লাভের জন্য কাজ করে (যাকে তিনি বলেন ‘ইরোস’ বা জীবনীশক্তি)। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর তিনি বলেন, মানুষের মনে আরও একটি শক্তি কাজ করে—‘থ্যানাটোস’ বা ধ্বংস প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তি মানুষকে নিজের ও অন্যের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ফ্রয়েড বলেন, এই প্রবৃত্তি যদি সমাজে প্রকাশের সুযোগ না পায়, তবে তা ক্ষতিকরভাবে বিস্ফোরিত হয়।

হতাশা ও আগ্রাসনের সম্পর্ক

১৯৩৯ সালে জন ডলার্ড এবং তার সহকর্মীরা “Frustration-Aggression Theory” প্রকাশ করেন। তারা বলেন, মানুষ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন তার মধ্যে চরম হতাশা কাজ করে, আর সেই হতাশা থেকেই জন্ম নেয় আগ্রাসী আচরণ।

তবে সবসময় মানুষ সেই ব্যক্তি বা জিনিসের উপর আগ্রাসন দেখায় না, যার কারণে সে হতাশ হয়েছে। অনেক সময় নিরাপদ কোনো লক্ষ্য বা দুর্বল গোষ্ঠীর উপর এই আচরণ প্রকাশ পায়, যাকে বলা হয় “Scapegoat” বা বলির পাঁঠা।

সামাজিক শিক্ষার প্রভাব

আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ আক্রমণাত্মক আচরণ জন্মসূত্রে নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে শেখে। ‘Social Learning Theory’ অনুযায়ী, মানুষ অন্যের আচরণ দেখে, তা অনুকরণ করে এবং উৎসাহ পেলে আরও আগ্রহী হয়।

আজকের দিনে টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ভিডিও গেম এবং সামাজিক মাধ্যমে সহিংস কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ায় শিশুরা অল্প বয়সেই আগ্রাসী আচরণ শিখছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিচারহীনতা এবং বিচার বহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনাও সমাজে এই আচরণকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?

আক্রমণাত্মক আচরণ মানুষের ভেতরে আদিকাল থেকেই ছিলো। তবে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে একটি সভ্য সমাজ গঠন করেছে। তাই এখন আমাদের দায়িত্ব হলো এই আচারগুলো নিয়ন্ত্রণ করা।

এর জন্য দরকার—

  • পরিবার ও সমাজে মানবিক মূল্যবোধ শেখানো,
  • শিশুদের ইতিবাচক ও ন্যায়ভিত্তিক আচরণে উৎসাহ দেওয়া,
  • রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ন্যায়ের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন,
  • মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ নিশ্চিত করা।

এভাবে যদি আমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করি, তাহলে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

Related Posts

a-minimalistic-digital-illustration-of-a_TVhTH27zQc2XRzb6Wjic2A_YLOurbf8QheKRTypYh9g2g
ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়ার কার্যকর উপায়: প্রমাণভিত্তিক ডিপ্রেশন চিকিৎসা
পরিচিতি রাশিদা, ৩২ বছর বয়সী একজন স্কুল শিক্ষিকা, কয়েক মাস ধরে নিজের জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন।...
Read More
65415927_10220002121871907_7213625086639603712_n
স্মার্টফোন ও সেলফি আসক্তি
স্মার্টফোন আসক্তি আজকাল বিভিন্ন ব্লগ, প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা থেকে জানতে পারছি, স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত...
Read More
S20223
দুঃশ্চিন্তার চিকিৎসা
বাস্তব জীবনের দুইটি পরিচিত দৃশ্য এক. মেধাবী ছাত্রী সোহানার সামনে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। করোনা পরিস্থিতির...
Read More
d20221
বিপদগ্রস্থ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা, না আসাঃ একটি মনো-সামাজিক বিশ্লেষণ।
ঘটনাটি কেমন ছিল? ধরা যাক, জনাকীর্ণ কোনো জায়গায় কয়েকজন মিলে একজন ব্যক্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আক্রান্ত...
Read More
A20225
মানসিকচাপ এড়াতে মাদকাসক্তি : কতটুকু সত্যি? নিয়ন্ত্রণের উপায়
আমরা কেন মাদক গ্রহণ করি? মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ বিভিন্ন উত্তেজক বা মাদকদ্রব্য ব্যবহার করে আসছে।...
Read More
Hysteria
হিস্টেরিয়াঃ অতীত থেকে বর্তমান, এখনো যে রোগ বুঝতে ও চিকিৎসা দিতে ভুল হয়।
একটি ভয়ের রাত – সোহানা (১৬) হঠাৎ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। বুক চাপড়ানো, অজ্ঞান হয়ে পড়ে...
Read More
Scroll to Top