একটি ভয়ের রাত – সোহানা (১৬) হঠাৎ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। বুক চাপড়ানো, অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা, খিঁচুনি – দেখে চিকিৎসকরা বুঝে ফেলেন, এটি ‘হিস্টেরিয়া’।
রাজিব (২৫) – আচমকা অদ্ভুত আচরণ, চোখ বড় বড় করে তাকানো, হাতমুখ বাঁকানো, কয়েক মিনিট পর আবার স্বাভাবিক। বহু ঘোরাঘুরির পর তিনি পৌঁছান একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে।
এই দুইজনের রোগের নাম – কনভার্সন ডিসঅর্ডার বা ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল সিম্পটম ডিসঅর্ডার, যেটিকে সাধারণভাবে হিস্টেরিয়া বলা হয়।
এই রোগটা আসলে কী?
কনভার্সন ডিসঅর্ডার মানে হলো – এমন কিছু শারীরিক উপসর্গ যা কোনও সুনির্দিষ্ট শারীরিক রোগের সাথে মেলে না, কিন্তু থাকে গভীর মানসিক চাপ বা অবদমিত দ্বন্দ্বের ফলাফল। অনেক সময় দেখা যায়, অতিরিক্ত মানসিক কষ্ট যখন প্রকাশের উপায় খুঁজে পায় না, তখন তা শারীরিক উপসর্গ হিসেবে বেরিয়ে আসে – যেমন, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
হিস্টেরিয়ার ইতিহাস একটু অবাক করার মতো!
- প্রাচীন মিশরে হিস্টেরিয়াকে বলা হতো জরায়ুর ঘুরে বেড়ানো (Wandering Uterus)।
- গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটাস “হিস্টেরা” (জরায়ু) শব্দ থেকে ‘হিস্টেরিয়া’ শব্দটি দেন।
- একসময় এটা ভাবা হতো – শয়তান বা জিনের প্রভাব!
- পরে সিগমুন্ড ফ্রয়েড দেখান, এটা অবচেতন মনের অবদমিত মানসিক দ্বন্দ্বের ফল।
হিস্টেরিয়া কি শুধুই নারীদের রোগ?
না। যদিও নারীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, তবে পুরুষরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। গ্রামের মানুষ, কম শিক্ষিত বা নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। ১০ বছরের নিচে ও ৩৫ বছরের পরে এই রোগ কম দেখা যায়।
রোগের লক্ষণ কী কী?
- হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- হাত-পা কাঁপা, অবশ হয়ে যাওয়া
- কথা বলতে না পারা
- চোখে দেখতে না পারা
- খিঁচুনি
- আচরণে পরিবর্তন বা ‘পাগলের মতো’ আচরণ
- নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা
চিকিৎসা কেমন হওয়া উচিত?
সঠিক চিকিৎসা মানেই কষ্ট দিয়ে রোগীকে জাগানো নয়! থাপ্পড়, ইনজেকশন দিয়ে ভয় দেখানো নয়! বরং…
প্রাথমিক চিকিৎসা:
- ইতিহাস ও উপসর্গ সংগ্রহ
- প্রয়োজনীয় শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা
- রোগী ও স্বজনদের আশ্বস্ত করা
- Reinforcement এড়িয়ে চলা (যেমন বারবার অক্সিজেন, হুইলচেয়ার)
- হালকা ওষুধে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ
মূল চিকিৎসা:
Exploratory Psychotherapy – অর্থাৎ রোগীর মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্ব খুঁজে বের করে তা মোকাবেলার উপায় শেখানো।
এটা ইন্টার্ন ডাক্তার থেকে শুরু করে যেকোন চিকিৎসকই করতে পারেন। প্রয়োজনে সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রাজিবের গল্পটা কি মনে আছে?
বিয়ের পর যৌন সমস্যায় পড়ে, কাউকে বলতে পারেনি। স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায়। এই মানসিক চাপ থেকে তার কনভার্সন ডিসঅর্ডার হয়। সাইকিয়াট্রিস্ট তার সমস্যার কথা শুনে কাউন্সেলিং ও যৌন চিকিৎসার আশ্বাস দেন।
আমাদের করণীয় কী?
- হিস্টেরিয়া ভং নয়
- এটি মানসিক চাপের শারীরিক বহিঃপ্রকাশ
- রোগীদের অপমান নয়, সহানুভূতি প্রয়োজন
- সঠিক চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে হবে
শেষ কথা:
মানসিক রোগ মানেই পাগলামি নয়। হিস্টেরিয়া মানে ভং নয়। বরং এটি এমন এক অব্যক্ত মানসিক যন্ত্রণার ফল, যা মন না পারলে শরীর প্রকাশ করে। আমাদের উচিত – রোগীদের সম্মান করা, বুঝে শুনে চিকিৎসা করা এবং ভুল ধারণা দূর করা।





